প্রযুক্তি

টিবি রোগ কি? টিবি রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার

টিবি রোগের লক্ষণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানুনঃ যক্ষা বা টিবি রোগ অতি প্রাচীন একটি রোগ।প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকে এই রোগটি মানুষের ছিল এবং এখনো আছে। বর্তমান সময়ে টিবি রোগকে মৃত্যুর চতুর্থ কারন হিসেবে মনে করা হয়। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের দেশে প্রতি বছর ৬০ হাজার রোগী টিবি বা যক্ষা রোগে মারা যায়। অবশ্য যাদের এ রোগ হয় যদি টিবি রোগের লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া মাত্রই চিকিৎসা নিলে এই মৃত্যুহার কমানো সম্ভব। তাই টিবি রোগ কি? টিবি বা যক্ষা রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন।

টিবি রোগ কি?

যক্ষা বা টিবি রোগের নাম হয়তো অনেকে শুনেছি। কিন্তু টিবি রোগ কি বা এর ডাক্তারি ভাষায় তা অনেকেরই অজানা। আসলে টিবি বা টিউবার্‌কিউলোসিস্‌ হল মাইকোব্যাক্টেরিয়াম টিউবারকিউলোসিস নামের জীবাণু দ্বারা সক্রমিত একটি রোগ। এই রোগটি প্রধানত ফুসফুস নাম অঙ্গে বেশি হতে দেখা যায়। তবে মানবদেহের অন্যান্য অঙ্গেও হতে পারে। কিন্তু হৃৎপিণ্ড, অগ্ন্যাশয়, ঐচ্ছিক পেশী ও থাইরয়েড গ্রন্থি এই অঙ্গগুলিতে টিবি রোগের জীবানুর উপস্থিত থাকে না।

টিবি রোগের প্রকারভেদ

টিউবারকুলেসিস বা টিবি রোগের লক্ষণ সম্পর্কে আলোচনা করলে প্রথমেই জানতে হবে ল্যাটেন্ট টিবি সম্পর্কে। আমাদের অনেকের মধ্যে টিবি রোগের সংক্রমণ হয়েছে কিন্তু তার লক্ষণ এখনো প্রকাশ পায় নি অর্থাৎ ব্যাক্টেরিয়া ইনএক্টিভ ফর্মে রয়েছে। কিন্তু এই ইনএক্টিভ ফর্ম থেকে যে কোন সময়ে এক্টিভ ফর্মে রুপান্তর হতে পার। এই ধরনের টিবি রোগকে ল্যাটেন্ট টিবি বলা হয়ে থাকে।

এক্টিভ টিবি অর্থাৎ দেহে টিউবারকুলেসিস জীবানু আছে যা এক্টিভ ফর্মে আছে। যা টিবি বা যক্ষা রোগের লক্ষণ প্রকাশ করবে। আর এই এক্টিভ অবস্থায় টিবি রোগ একজন থেকে উপর একজনে সংক্রমিত করতে থাকে।

টিবি রোগের লক্ষণ

সম্প্রতি এক গবেষণার মাধ্যমে জানা গেছে, বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ যক্ষা বা টিবি রোগে আক্রান্ত। যাদের অধিকাংশই এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের বাসিন্দা। তাই টিবি রোগের লক্ষণ প্রকশ পাওয়া মাত্রই সচেতন না হলে এর সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকবে। আপনার আশেপাশের মানুষের যক্ষা বা টিবি রোগ হয়েছে কিনা লক্ষণগুলি দেখে সহজেই বুঝতে পারবেন। যেহেতু এই রোগের জীবানু হাচিঁ কাশির মাধ্যমে ছাড়ায় তাই লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া মাত্রই সতর্ক হতে হবে। চলুন তাহলে টিবি বা যক্ষা রোগের লক্ষণ সমূহ জেনে নেই।

১। শুষ্ক কাশিঃ টিবি রোগে লক্ষণ সমূহের মধ্যে শুষ্ক কাশি হওয়া অন্যতম লক্ষণ। কোন ব্যক্তির যদি ৩ সপ্তাহ বা এর থেকে বেশি সময় ধরে কাশি থাকে তাহলে বুঝতে হবে তার যক্ষা হয়েছে।

২। বুক ব্যথা ও শ্বাসকষ্টঃ অনেক সময় কাশির সাথে প্রচন্ড বুক ব্যথা অনুভূত হতে পারে। বুক ব্যথার সাথে যদি শ্বাসকষ্টের সমস্যা দেখা যায় তাহলে যত দ্রুত সম্ভব এর পরিক্ষা করা।

৩। কফের সাথে রক্ত আসাঃ যক্ষা আক্রান্ত রোগীর ফুসফুসে কফ জমে যায়। মাইক্রোব্যাক্টেরিয়াম টিউবাকুলেসিস রোগের জীবানু যখন ফুসফুসকে সংক্রমন করে তখন কফের সাথে রক্ত আসতে দেখা যায়। এই কফ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চত হওয়া যায় তার যক্ষা হয়েছে কি না।

টিবি রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার
টিবি রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার

৪। ওজন কমে যাওয়াঃ টিবি বা যক্ষা রোগে আক্রান্ত রোগীর দেহের ওজন দিন দিন কমতে থাকে। শরীর দুর্বল ও নিস্তেজ হয়ে পড়ে।

৫। ক্ষুধামন্দাঃ যখন যক্ষা রোগের জীবানু ফুসফুসকে সংক্রমিত করে তখন ফুসফুসে কফ বা ফ্লুইড জমতে দেখা যায়। এই অবস্থায় অনেক রোগীর খাবারের প্রতি অনীহা তৈরি হয়। খাবার ভাল লাগে না আবার অনেকে খাবার না খেয়েই দিন কাটায়।

৬। শরীর ঘামাঃ অনেক সময় টিবি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে জ্বরের পরিমাণ বেড়ে যায়। আবার রাতের বেলায় শরীর ঘামতেও দেখা যায়। যা টিবি রোগের লক্ষণকে নির্দেশ করে থাকে। তাই শরীর ঘামা, জ্বর ও কফ হলে একটু সচেতন হতে হবে।

উপরের আলোচনার যে কোন ধরনের টিবি রোগের লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া মাত্রই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

টিবি রোগের পরীক্ষা

 টিবি রোগ মাইক্রো ব্যাকটেরিয়াম টিউবারকুলোসিস জীবাণু দিয়ে হাঁচি কাশির মাধ্যমে সংক্রমিত হয়। একটানা তিন সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে কাশি হওয়া এ রোগের প্রধান লক্ষণ। কাশির সাথে সাথে রক্তযুক্ত কফ, জ্বর ও রাতে ঘাম হওয়ার লক্ষণও দেখা দিতে পারে। এই রোগের উপস্থিতি  কফ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায়। 

 এছাড়াও যক্ষা বা টিভি রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রথমে এমপি পরীক্ষা করা হয়। এরপর স্পুটাম পরীক্ষার মাধ্যমে আরো নিশ্চিত হওয়া যায়।এফএনএসি ও বকের এক্স রে মাধ্যমে যক্ষা বা টিবি রোগ নির্ণয় করা হয়ে  থাকে।

টিবি রোগের ঘরোয়া চিকিৎসা

প্রাচীনকালে টিবি রোগ মারাত্মক ব্যাধি নামে পরিচিত ছিল।  চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে এর উক্তি সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব। আপনি চাইলে ঘরোয়া পদ্ধতির মাধ্যমে টিবি রোগ থেকে মুক্তি পেতে পারেন। তাই টিবি রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় হিসেবে কয়েকটি ঘরোয়া পদ্ধতি জেনে যাকঃ

১।প্রতিদিন সকালবেলা কয়েক টুকরো কাঁচা রসুনের কোয়া চিবিয়ে খেলে টিবি রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

২। কলা মানব দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। তাই বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা টিবি রোগীদের রোগ প্রতিরোধক হিসেবে কলা খাওয়ার পরামর্শ দেন।

৩। লবঙ্গের গুড়াঁর সাথে মধু মিশ্রিত  করে খেলেও এরূপ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

৪। অশ্ব পাতা দিয়ে ফুটানো দুধ খেলে এই রোগ অনেকটাই কমে যায়।

৫। মাখন ও দুধ শরীরের ক্ষয় রোধ করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। কোন ব্যক্তির দেহে টিবি বা যক্ষা রোগের লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া মাত্রই দুধ ও মাখন খেলে শরীরের ক্ষয়রোধ করে রোগটি থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ হয়

টিবি রোগের লক্ষণ

টিবি রোগ কি? টিবি রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার
টিবি রোগ কি? টিবি রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার

টিবি রোগের চিকিৎসা

আমাদের দেশে টিবি রোগ পরীক্ষাও চিকিৎসার জন্য সরকারিভাবে অনেক ব্যবস্থা রয়েছে। কোন ব্যক্তির দেহে টিবি রোগ দেরিতে নির্ণয় হলে তা ফুসফুসকে ক্ষতি করে ফেলে। অনেক সময় টিবি রোগ সেরে গেলও তার ধ্বংসলীলা থেমে থাকে না। তাই টিবি রোগের সঠিক চিকিৎসার প্রয়োজন। একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নির্ধারন করবেন আপানার কেমন চিকিৎসার প্রয়োজন। তাই টিবি রোগের লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া মাত্রই ডাক্তারের শরনাপন্ন হতে হবে। ডাক্তার দেওয়া দিকনির্দেশনার মাধ্যমে টিবি রোগ থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ্য হওয়া সম্ভব।

টিবি রোগের ঔষধের নাম

আপনাদের অনেকে টিবি রোগের ঔষধের নাম সম্পর্কে জানতে চান। কিন্তু কোন ঔষধই ডাক্তার পরামর্শ ছাড়া খাওয়া উচিত নয়। এক ব্যক্তির দেহে টিবি বা যক্ষা রোগের লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া মাত্রই প্রম্থে কফ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় তার টিবি রোগ হয়েছে কি না। এরপর বিশেষজ্ঞ ডাক্তারগণ নিচের ঔষধগুলি খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

১। আইসোনিয়াজিড

২। রিফা্মপিন

৩। পাইরাজিনামাইড

৪। রিফাপেনটিন

৫। ইথামবিউটল

পরিশেষে,

যে কোন রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার পূর্বশর্ত হলো সেই রোগ সম্পর্কে সচেতন থাকা। টিবি রোগের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। আপানার দেহে টিবি রোগের লক্ষণ দেখা মাত্রই আপনার আশেপাশের ভাল ডাক্তারের পরামর্শ নিন। এই রোগটি মাইক্রোব্যাক্টেরিয়াল জীবানুর মাধ্যমে সংক্রমিত হয়ে থাকে। তাই যে সকল মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে তাদের থেকে দূরে থাকার পরামর্শ থাকবে। আর সঠিক সময়ে এই রোগের চিকিৎসা না করালে মৃত্যু হতে পারে। তাই এ রোগকে অবহেলা না করে সঠিক ডাক্তারের থেকে চিকিৎসা নিতে হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button